নরওয়ের মোট আয়তন ৩,৮৫,২০৭ বর্গকিলোমিটার[৭] ও ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৫৪ লক্ষ ২৫ হাজার।[২] নরওয়ে ইউরোপের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন জনঘনত্ববিশিষ্ট রাষ্ট্র। এখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১৬.৫৩ জন ব্যক্তির বাস।[৮][৯] দেশটির সাথে পূর্ব দিকেসুইডেনের এক সুদীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৬১৯ কিলোমিটার। নরওয়ের উত্তর-পূর্বেফিনল্যান্ড ওরাশিয়া, দক্ষিণে স্কাগেরাক প্রণালী, যার অপর তীরেডেনমার্ক ওযুক্তরাজ্য অবস্থিত। নরওয়ের রয়েছে এক সুবিস্তৃত তটরেখা, যাউত্তর আটলান্টিক মহাসাগর ও ব্যারেন্টস সাগরের দিকে মুখ করে আছে। নরওয়ের জলবায়ুর উপর সমুদ্রের আধিপত্যমূলক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে উপকূলীয় নিম্নভূমিগুলিগুলিতে জলবায়ু মৃদু। দেশের অভ্যন্তরভাগ অপেক্ষাকৃত বেশি শীতল হলেও বিশ্বের একই অক্ষাংশে অবস্থিত অন্যান্য উত্তরীয় দেশগুলির তুলনায় এখানকার জলবায়ু অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক মৃদু। মেরুদেশীয় রাত্রিকালীন সময়েও উপকূলের বহু স্থানে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরেই বিরাজ করে। সামুদ্রিক প্রভাবের কারণে দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে উচ্চ মাত্রায়বৃষ্টিপাত ওতুষারপাত হয়।
নরওয়েতে একটিসাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রচলিত। গ্লুকসবুর্গ রাজবংশের ৫ম হারাল্ড দেশটির বর্তমান রাজা। ২০২১ সাল থেকে ইউনাস গা ষ্টোরে দেশটির সরকার প্রধান। নরওয়ে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রবিশিষ্ট এককেন্দ্রিক সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর সংসদ, মন্ত্রীসভা ও সর্বোচ্চ আদালতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিভক্ত করা হয়েছে, যার ভিত্তি দেশটির ১৮১৪ সালে প্রণীত সংবিধান। নরওয়ে রাজ্যটি ৮৭২ সালে অনেকগুলি ক্ষুদ্রতর রাজ্য একত্রিত করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ধারাবাহিকভাবে ১৮৭২ বছর ধরে দেশটি টিকে আছে। ১৫৩৭ থেকে ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নরওয়ে বৃহত্তর ডেনমার্ক-নরওয়ে রাজ্যের অংশ ছিল। ১৮১৪ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত এটি সুইডেন রাজ্যের সাথে একটি ব্যক্তিগত ঐক্যের অংশ ছিল।১ম বিশ্বযুদ্ধের সময় নরওয়ে নিরপেক্ষ ছিল। ১৯৪০ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্তও এটি নিরপেক্ষতা বজায় রাখে। ঐ মাসেনাৎসি জার্মান বাহিনী ভেজার্যুবুং অভিযানের মাধ্যমে নরওয়ে আক্রমণ করে ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত দেশটি দখল করে রাখে।
নরওয়ের প্রশাসন ও রাজনীতি দুইটি স্তরে বিভক্ত: কাউন্টি ও পৌরসভাসমূহ। সামি নৃগোষ্ঠীর লোকদের ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলগুলির উপরে সামি সংসদ ও ফিনমার্ক অধ্যাদেশের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাত্রায় আত্ম-নির্ধারণী ক্ষমতা ও প্রভাব আছে। নরওয়েইউরোপীয় ইউনিয়ন ওমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। দেশটিজাতিসংঘ,উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট, ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংঘ,ইউরোপীয় পরিষদ, অ্যান্টার্কটিক চুক্তি, নর্ডীয় পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এছাড়া এটি ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল,বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও ওইসিডি-র সদস্য এবং এটি শেঙেন অঞ্চলের অংশবিশেষ গঠন করেছে। অধিকন্তু,নরওয়েজীয় ভাষাগুলিডেনীয় ভাষা ওসুয়েডীয় ভাষার সাথে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় পারস্পরিক বোধগম্য।
নরওয়েতে নর্ডীয় সমাজকল্যাণ প্রতিমানটি প্রচলিত, যার মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত, যার মূল্যবোধগুলির শেকড় সমতাভিত্তিক আদর্শে প্রোথিত।[১০] নরওয়েজীয় রাষ্ট্র প্রধান প্রধান শিল্পখাতগুলির বড় অংশের মালিকানার অধিকারী। দেশটিরখনিজ তেল,প্রাকৃতিক গ্যাস,খনিজ,কাঠ,সামুদ্রিক খাদ্য ওসুপেয় পানির বিশাল মজুদ আছে। খনিজ তেল শিল্পখাতটি দেশের স্থূল জাতীয় উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী।[১১] মাথাপিছু হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নরওয়ে বিশ্বের বৃহত্তম খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক।[১২][১৩]
বিশ্বব্যাংক ওআন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তালিকায় দেশটি মাথাপিছু স্থূল জাতীয় উৎপাদন (ক্রয়ক্ষমতার সমতা গণনায় ধরে) বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ।[১৪] তবে মার্কিন রাষ্ট্রীয় গুপ্তচর সংস্থা সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সির ২০১৫ সালের তালিকা অনুযায়ী স্বশাসিত ভূখণ্ড ও অঞ্চলগুলিসহ ঐ সূচকে নরওয়ের অবস্থান ১১তম।[১৫] দেশটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ সার্বভৌম সম্পত্তি তহবিলের অধিকারী, যার মূল্যমান ১ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার।[১৬] ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে নরওয়ে মানব উন্নয়ন সূচকে বিশ্বের শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্তও দেশটি বিশ্বের শীর্ষস্থানে ছিল।[১৭]
এছাড়া ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য উপযোজিত মানব উন্নয়ন সূচকের শীর্ষে ছিল।[১৮] বিশ্ব সুখ প্রতিবেদনে ২০১৭ সালে নরওয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে।[১৯] বর্তমানে এটি ওইসিডি উন্নত জীবন সূচক, সরকারি সাধুতা, মুক্তি সূচক[২০] ও গণতন্ত্র সূচকে প্রথম স্থানে অবস্থান করছে।[২১] নরওয়ের অপরাধের হার বিশ্বের সর্বনিম্নগুলির একটি।[২২]
যদিও নরওয়ের জনগণের সিংহভাগ নৃগোষ্ঠীগতভাবে নরওয়েজীয়, ২১শ শতকে এসে বিদেশী অভিবাসীদের আগমন দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির অর্ধেকের বেশি অবদান রেখেছে। ২০২১ সালে দেশটির ৫টি সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠী ছিল পোলীয়, লিথুয়ানীয়, সোমালি,পাকিস্তানি ওসুয়েডীয় অভিবাসীরা।
নরওয়েউত্তর ইউরোপেরস্ক্যান্ডিনেভিয়ার পশ্চিম অংশে অবস্থিত। নরওয়েসুইডেন সঙ্গে ১,৬১৯ কিলোমিটার (১,০০৬ মাইল),ফিনল্যান্ড সঙ্গে ৭২৭ কিলোমিটার (৪৫২ মাইল), এবং পূর্ব রাশিয়া সঙ্গে ১৯৬ কিলোমিটার (১২২ মাইল) সীমানা আছে। নরওয়ের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে ব্যারেন্টস সাগর, নরওয়েজিয়ান সাগর, উত্তর সাগর, এবং Skagerrak অবস্থিত।% পুরুষ। অভিবাসী জনগোষ্ঠীর আকার মাত্র ২১৩৪৯ জন। নরওয়ে ইউরোপের দ্বিতীয় জনবহুল রাষ্ট্র। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যা ১৬’৫৩ জন। তবে ১৬৬৫ সালে জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৪ লক্ষ ৪০ হাজার।[৮][৯]
এই দেশটি শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ৬.৭% খরচ করে যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। বিশেষত স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা পর্যন্ত। জাতীয়তা ভেদে এখানে অবৈতনিক শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু আছে।
নরওয়েজিয়ান ভাষার দুটি রূপ, বোকমল এবং নিয়নরস্ক, নরওয়ের প্রধান জাতীয় সরকারি ভাষা। সামি, যা তিনটি ভিন্ন ভাষার সমন্বয়ে গঠিত, জাতীয় স্তরে একটি সংখ্যালঘু ভাষা হিসেবে স্বীকৃত এবং নরওয়ের সামি প্রশাসনিক ভাষাগত অঞ্চলে (Forvaltningsområdet for samisk språk) নরওয়েজিয়ান ভাষার পাশাপাশি একটি সহ-সরকারি ভাষা হিসেবে রয়েছে। কভেন একটি সংখ্যালঘু ভাষা এবং নরওয়ের উত্তরের একটি পৌরসভায় নরওয়েজিয়ানের পাশাপাশি একটি সহ-সরকারি ভাষা।
অসলোর রাজপ্রাসাদসস্ত্রীক পঞ্চম হ্যারাল্ডনরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গহর স্টোর (১৪ অক্টোবর ২০২১ সাল থেকে)নরওয়ের সংসদভবন।
নরওয়েকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত গণতন্ত্র এবং অন্যতমন্যায়বিচারপূর্ণ রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ২০১০ সাল থেকে, গণতন্ত্র সূচক অনুসারে নরওয়ে বিশ্বের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ হয়ে আসছে।[২৩][২৪]
রাজা আনুষ্ঠানিকভাবে শাসন ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর থেকে রাজার কর্তব্য মূলত প্রতিনিধিত্বমূলক এবং আনুষ্ঠানিক।[২৬] রাজা সশস্ত্র বাহিনীরসর্বাধিনায়ক, এবং বিদেশে প্রধান কূটনৈতিক কর্মকর্তা এবং ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে বর্তমান রাজা শ্লেসউইগ-হোলস্টাইন-সোন্ডারবার্গ-গ্লুকসবার্গ বংশের পঞ্চম হ্যারাল্ড নরওয়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন।[২৭] ক্রাউন প্রিন্স হাকন হলেন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী।
বাস্তবে, প্রধানমন্ত্রী শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। সাংবিধানিকভাবে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নরওয়ের সরকার এবং এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ উভয়ের হাতে ন্যস্ত।[২৮] নরওয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র হিসেবে গঠিত। সংসদ ১৬৯ জন প্রতিনিধির সরল সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে আইন পাস করতে পারে, যার মধ্যে ১৫০ জন ১৯টি নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি নির্বাচিত হন এবং জাতীয় পর্যায়ে অতিরিক্ত ১৯টি আসন ("সমানকরণ আসন") বরাদ্দ করা হয় যাতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব রাজনৈতিক দলগুলির প্রাপ্ত ভোটের সাথে আরও ভালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সংসদে সমানীকরণ আসন পেতে হলে কোনো দলের ৪% নির্বাচনী ভোট প্রয়োজন।[২৯]
নরওয়ের সংসদ, যাস্টর্টিং নামেও পরিচিত, শাসনবিভাগ কর্তৃক প্রণীত জাতীয় চুক্তিকে অনুমোদন করে। সরকারের সদস্যদের কাজ অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলে সংসদ তাদেরঅভিশংসন করতে পারে। যদি কোনও অভিযুক্ত সন্দেহভাজনকে অভিশংসিত করা হয়, তাহলে সংসদের সেই ব্যক্তিকে পদ থেকে অপসারণ করার ক্ষমতা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শাসনবিভাগ পরিচালনা করেন এবং সংবিধান দ্বারা অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।[৩০]
নরওয়ের একটি রাষ্ট্রীয় গির্জা রয়েছে, নরওয়ের লুথেরান চার্চ, যা ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজে আরও অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন লাভ করেছে, তবে এখনও এর বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা রয়েছে। পূর্বে, প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার অর্ধেকেরও বেশি সদস্যকে নরওয়ের চার্চের সদস্য হতে হত; এই নিয়মটি ২০১২ সালে বাতিল করা হয়েছিল। নরওয়েতে গির্জা ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের বিষয়টি ক্রমশ বিতর্কিত হয়ে উঠছে। এর একটি অংশ হল পাবলিক স্কুল বিষয় খ্রিস্টধর্মের বিবর্তন, যা ১৭৩৯ সাল থেকে একটি বাধ্যতামূলক বিষয়। ২০০৭ সালেস্ত্রাসবুরেইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে[৩১] এক মামলায় রাষ্ট্রের পরাজয়ও বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে পারেনি। ১ জানুয়ারী ২০১৭ থেকে, নরওয়ের চার্চ একটি পৃথক আইনি সত্তা, এবং আর সিভিল সার্ভিসের শাখা নয়।[৩২] রাজ্য পরিষদের মাধ্যমে, রাজার সভাপতিত্বে প্রিভি কাউন্সিল, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভা রাজপ্রাসাদে মিলিত হন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার সাথে পরামর্শ করেন। সমস্ত সরকারি বিল সংসদে উপস্থাপনের আগে এবং পরে রাজার আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কাউন্সিল রাজার সকল পদক্ষেপ অনুমোদন করে।[২৭]
নরওয়ে, একটিএককেন্দ্রিক রাষ্ট্র, পনেরোটি প্রথম-স্তরের প্রশাসনিককাউন্টি (fylke)-তে বিভক্ত।[৩৩] কাউন্টিগুলি সরাসরি নির্বাচিত কাউন্টি কাউন্সিল-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যারা কাউন্টি মেয়র নির্বাচন করে। এছাড়াও, রাজা এবং সরকার প্রতিটি কাউন্টিতে একজন কাউন্টি গভর্নর (নরওয়েজীয়:statsforvalteren) মনোনীত করেন।[৩৪] কাউন্টিগুলি আরও ৩৫৭টি দ্বিতীয়-স্তরের মিউনিসিপ্যালিটি (নরওয়েজীয়:kommuner)-তে বিভক্ত, যেগুলি সরাসরি নির্বাচিত মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল দ্বারা পরিচালিত হয়, যার নেতৃত্বে থাকেন একজন মেয়র এবং একটি ছোট নির্বাহী মন্ত্রিসভা। রাজধানীঅসলো একই সঙ্গে কাউন্টি এবং মিউনিসিপ্যালিটি হিসেবে বিবেচিত হয়। নরওয়ের মূল ভূখণ্ডের বাইরে দুটি অঞ্চল রয়েছে: জান মায়েন এবংস্ভালবার্ড।[৩৫]
নরওয়েতে ১০৮টি বসতি রয়েছে যেগুলির শহর/নগর মর্যাদা রয়েছে (নরওয়েজিয়ান শব্দby এই স্থানগুলির জন্য ব্যবহৃত হয় এবং শব্দটি শহর বা নগর হিসেবে অনুবাদ করা যেতে পারে)। ঐতিহাসিকভাবে নরওয়েতে শহর রাজার দ্বারা মনোনীত হত এবং আইনের অধীনে বিশেষ নিয়ম ও সুবিধা পেত। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এর পরিবর্তন হয়, তাই এখন শহর/নগরের কোনো বিশেষ অধিকার নেই এবং মিউনিসিপ্যালিটি একটি শহুরে বসতিকে শহর/নগর হিসেবে মনোনীত করতে পারে। শহর বা নগরের বড় হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিছু শহরে দশ লক্ষেরও বেশি বাসিন্দা রয়েছে, আবার কিছু অনেক ছোট যেমন হনিংসভোগ যেখানে প্রায় ২,২০০ বাসিন্দা রয়েছেন। সাধারণত, একটি মিউনিসিপ্যালিটির মধ্যে একটি মাত্র শহর থাকে, তবে কিছু মিউনিসিপ্যালিটিতে একাধিক শহর থাকে (যেমন লারভিক মিউনিসিপ্যালিটি যেখানে লারভিক শহর এবং স্ট্যাভার্ন শহর রয়েছে।[৩৬]
নরওয়ে সিভিল আইন ব্যবস্থা ব্যবহার করে যেখানে আইন সংসদে প্রণয়ন ও সংশোধন করা হয় এবং এই ব্যবস্থাটি নরওয়ের বিচারালয়-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এটি সুপ্রিম কোর্ট-এর ২০ জন স্থায়ী বিচারক এবং একজন প্রধান বিচারপতি, আপিল কোর্ট, শহর এবং জেলা আদালত, এবং মীমাংসা পরিষদ নিয়ে গঠিত।[৩৮] বিচার বিভাগটি শাসন এবং আইন শাখা থেকে স্বাধীন। যদিও প্রধানমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের পদে মনোনয়ন দেন, তবে তাদের মনোনয়ন সংসদের অনুমোদন এবং রাজার আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের প্রয়োজন হয়। সাধারণত, নিয়মিত আদালতের সাথে সংযুক্ত বিচারকদের প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাজা আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ করেন।
আদালতের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য হল নরওয়ের বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা, সংবিধানের ব্যাখ্যা করা এবং সংসদ কর্তৃক গৃহীত আইন বাস্তবায়ন করা।[৩৮]
আইন নরওয়েজীয় পুলিশ সার্ভিস দ্বারা প্রয়োগ করা হয়। এটি একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পুলিশ সার্ভিস যা ২৭টি পুলিশ জেলা এবং কয়েকটি বিশেষ সংস্থা নিয়ে গঠিত। পুলিশ সার্ভিস জাতীয় পুলিশ ডিরেক্টরেট দ্বারা পরিচালিত হয়, যা বিচার ও পুলিশ মন্ত্রণালয়ের কাছে রিপোর্ট করে। পুলিশ ডিরেক্টরেট একজন জাতীয় পুলিশ কমিশনার দ্বারা পরিচালিত হয়। একমাত্র ব্যতিক্রম হল নরওয়েজীয় পুলিশ নিরাপত্তা এজেন্সি, যার প্রধান সরাসরি বিচার ও পুলিশ মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহি করেন।
নরওয়ে ১৯০২ সালে সাধারণ অপরাধমূলক কাজের জন্য এবং ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করে। নরওয়ের কারাগারগুলি কঠোরতার পরিবর্তে মানবিক পুনর্বাসনের উপর জোর দেয়।[৩৯]
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, ২০২৪ ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স-এ, নরওয়েকে ১৮০টি দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে রেখেছে।[৪০] সাধারণভাবে, নরওয়ের আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উচ্চ মাত্রার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সততা দ্বারা চিহ্নিত, এবং দুর্নীতির ধারণা এবং ঘটনা খুবই কম।[৪১]
নরওয়ে প্রগতিশীল দেশ হিসেবে বিবেচিত, এখানেনারী অধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার এবং এলজিবিটি অধিকার সমর্থনের জন্য আইন ও নীতি রয়েছে। ১৮৮৪ সালের প্রথম দিকে, ১৭১ জন প্রধান ব্যক্তিত্ব, যাদের মধ্যে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তারা নরওয়েজিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর উইমেন্স রাইটস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।[৪২] তারা নারীদেরশিক্ষার অধিকার,নারী ভোটাধিকার, কাজের অধিকার এবং অন্যান্য লিঙ্গ সমতা নীতির জন্য সফলভাবে প্রচারণা চালান। ১৯৭০-এর দশক থেকে, লিঙ্গ সমতা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব পেয়েছে, যার ফলে লিঙ্গ সমতা প্রচারের জন্য একটি সরকারি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে লিঙ্গ সমতা ও বৈষম্যবিরোধী ওমবুড-এ রূপান্তরিত হয়। সুশীল সমাজ সংগঠনগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে; নারী অধিকার সংগঠনগুলো আজ নরওয়েজিয়ান উইমেন্স লবি সংগঠনের আওতায় সংগঠিত।
সামি জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেস্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং রাশিয়ার অন্যান্য সংস্কৃতি দ্বারা বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছে।[৪৩] নরওয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্বারা নরওয়েজীয়করণ নীতি এবং দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যের জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।[৪৪] তবুও, নরওয়ে ১৯৯০ সালে জাতিসংঘের সুপারিশকৃত আইএলও কনভেনশন ১৬৯ স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দেশ ছিল।
নরওয়ে বিশ্বের প্রথম দেশ যেখানে সমকামীদের অধিকার রক্ষার জন্য বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে, নরওয়ে সমকামী দম্পতিদের জন্য সিভিল ইউনিয়ন বৈধকরণকারী দ্বিতীয় দেশ হয়ে ওঠে। ১ জানুয়ারি ২০০৯-এ, নরওয়ে সমকামী বিবাহ বৈধকরণকারী ষষ্ঠ দেশ হয়ে ওঠে।[৪৫] নরওয়ে বার্ষিক অসলো স্বাধীনতা ফোরাম সম্মেলন আয়োজন করে, যাকেদি ইকোনোমিস্ট "ডাভোস অর্থনৈতিক ফোরামের মানবাধিকার সমতুল্য হওয়ার পথে" হিসেবে বর্ণনা করেছে।[৪৬]
নরওয়ের ৭৫টি দেশে দূতাবাস আছে।[৪৭] ৭৩টি দেশের নরওয়েতে দূতাবাস আছে, সবগুলোই রাজধানী অসলোতে অবস্থিত।
নরওয়েজাতিসংঘ ,ন্যাটো,ইউরোপীয় কাউন্সিল এবং ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। নরওয়ে ১৯৬২, ১৯৬৭ এবং ১৯৯২ সালে যথাক্রমেইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর পূর্বসূরীদের সদস্যপদের জন্য আবেদন জমা দিয়েছিল। কিন্তু নরওয়ের ভোটাররা গণভোটের মাধ্যমে সদস্যপদের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে।
১৯৯৪ সালের গণভোটের পর, নরওয়ে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকায় সদস্যপদ বজায় রাখে, যা দেশটিকে ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশাধিকার দেয়, এই শর্তে যে নরওয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু আইন বাস্তবায়ন করবে।[৪৮] ১৯৯৪ সাল থেকে পরবর্তী নরওয়েজিয়ো সরকারগুলো EEA চুক্তির বিধানের বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতার অংশগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছে। নরওয়েকে ভোটাধিকারবিহীন অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, উদাহরণস্বরূপ, ইউনিয়নের সাধারণ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতি, শেনজেন চুক্তি, এবং ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সংস্থা, পাশাপাশি ১৯টি পৃথক কর্মসূচিতে।[৪৯]
নরওয়ে ১৯৯০-এর দশকেঅসলো চুক্তির মধ্যস্থতায় অংশ নিয়েছিল, যা ছিল ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংঘাত সমাধানের একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
প্রথম নরওয়েজিয়ান F-35 Lightning II লুক এয়ার ফোর্স বেসে অবতরণ করছে।
সশস্ত্র বাহিনীতে প্রায় ২৫,০০০ জন কর্মী রয়েছে, যার মধ্যে বেসামরিক কর্মচারীরাও অন্তর্ভুক্ত। নরওয়েতে বাধ্যতামূলক সামরিক অন্তর্ভুক্তি রয়েছে (৬-১২ মাসের প্রশিক্ষণ সহ);[৫০] ২০১৩ সালে দেশটি ইউরোপ এবং ন্যাটোতে প্রথমবারের মতো পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদেরও ভর্তি করার নীতি গ্রহণ করে। তবে,ঠান্ডা যুদ্ধ-এর পরে সৈনিকদের প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ায়, যারা উৎসাহী নন তাদের মধ্যে খুব কম লোককেই যোগ দিতে হয়।[৫১] সশস্ত্র বাহিনী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সর্বাধিনায়ক হলেন রাজা। নরওয়ের সশস্ত্র বাহিনী সেনাবাহিনী, রাজকীয় নৌবাহিনী, রাজকীয় বিমান বাহিনী, সাইবার প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং হোম গার্ডে বিভক্ত।
দেশটি ৪ এপ্রিল ১৯৪৯ সালেন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলোর মধ্যে একটি ছিল। নরওয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা বাহিনী (ISAF)-তে আফগানিস্তান যুদ্ধে অবদান রেখেছে।[৫২] এছাড়াও, নরওয়ে জাতিসংঘ, ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতি-র প্রেক্ষাপটে বেশ কয়েকটি মিশনে অবদান রেখেছে।
নরওয়ের দাবিকৃত অর্থনৈতিক অঞ্চলইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থার (সবুজ) সদস্যরা ইউরোপীয় একক বাজারে অংশগ্রহণ করে এবংশেংগেন অঞ্চলের অংশ।
ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে (লুক্সেমবার্গের পরে) নরওয়েজীয়রা দ্বিতীয় সর্বোচ্চমাথাপিছু জিডিপি এবং বিশ্বে ষষ্ঠ সর্বোচ্চমাথাপিছু জিডিপি (পিপিপি) উপভোগ করে। নরওয়ে আর্থিক মূল্যের দিক থেকে দ্বিতীয় ধনী দেশ, যেখানে মাথাপিছু মূলধনের রিজার্ভ সবচেয়ে বেশি।[৫৩] ২০০৯ সালে নরওয়েUNDPমানব উন্নয়ন সূচকে (HDI) বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করেছিল।[১৭] নরওয়ের জীবনযাত্রার মান বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন ২০০৯ এবং ২০২৩ সালের ব্যর্থ রাষ্ট্র সূচকে নরওয়েকে শেষ স্থানে রেখেছে, অর্থাৎ নরওয়ে তাদের মতে বিশ্বের সবচেয়ে সু-কার্যকর এবং স্থিতিশীল দেশ। ২০১৩ সালের সমীক্ষা অনুসারে,OECD নরওয়েকে চতুর্থ স্থানে রেখেছে, যেখানে উন্নত জীবন সূচকে চতুর্থ এবং প্রজন্মের মধ্যে আয়ের স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে তৃতীয় স্থান পেয়েছে।[৫৪][৫৫]
নরওয়েজীয় অর্থনীতিমিশ্র অর্থনীতির উদাহরণ; একটি সমৃদ্ধ পুঁজিবাদীকল্যাণ রাষ্ট্র, এতেমুক্ত বাজার কার্যকলাপ এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বৃহৎ রাষ্ট্রীয় মালিকানার সংমিশ্রণ রয়েছে, যা উনিশ শতকের শেষের দিকের উদারপন্থী সরকার এবং পরবর্তীতে যুদ্ধোত্তর যুগে সামাজিক গণতান্ত্রিক সরকার উভয়ের দ্বারা প্রভাবিত।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] নরওয়েতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে (১৬ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য বার্ষিক প্রায় ২০০০ ক্রোনার চার্জের পর), এবং নবজাতকের পিতামাতাদের ৪৬ সপ্তাহের বেতনভুক্ত[৫৬] ছুটি দেওয়া হয়। প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় আয়ের মধ্যে পেট্রোলিয়াম উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির হিসেব অনুযায়ী নরওয়েতে বেকারত্বের হার ৩.৯%, যেখানে ১৫-৭৪ বছর বয়সের জনসংখ্যার ৬৯.৭% বেকার নয়। নরওয়ের ঘণ্টা প্রতি উৎপাদনশীলতার স্তর এবং ঘণ্টা প্রতি গড় মজুরি বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।[৫৭][৫৮]
নরওয়েজিয়ান সমাজের সমতাবাদী মূল্যবোধের কারণে বেশিরভাগ কোম্পানির সবচেয়ে কম বেতনের কর্মী এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে মজুরির পার্থক্য তুলনামূলক পশ্চিমা অর্থনীতির তুলনায় অনেক কম।[৫৯]
কৌশলগত পেট্রোলিয়াম সেক্টর (ইকুইনর), জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন ( স্ট্যাটক্রাফ্ট ), অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন ( নরস্ক হাইড্রো ), বৃহত্তম নরওয়েজিয়ান ব্যাংক ( ডিএনবি ), এবং টেলিযোগাযোগ সরবরাহকারী (টেলিনর ) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে রাষ্ট্রের বিশাল মালিকানা রয়েছে। এই বৃহৎ কোম্পানিগুলির মাধ্যমে, সরকার অসলো স্টক এক্সচেঞ্জের প্রায় ৩০% স্টকের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে।
তেল উৎপাদন ১৯৭০-এর দশক থেকে নরওয়ের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে
তেল ও গ্যাস থেকে রপ্তানি আয় মোট রপ্তানির ৪০% এরও বেশি এবং জিডিপির প্রায় ২০%।[৬০] নরওয়ে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক এবং তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাস রপ্তানিকারক। ১৯৯৫ সালে, নরওয়ের সরকার তেল আয় দিয়ে অর্থায়িত একটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল "গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড – গ্লোবাল" প্রতিষ্ঠা করে।
সরকার তেল ক্ষেত্রের প্রধান অপারেটরদের মাধ্যমে পেট্রোলিয়াম সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়াও, সরকার অনুসন্ধান এবং উৎপাদন ক্ষেত্রের লাইসেন্সিং নিয়ন্ত্রণ করে। তহবিলটি নরওয়ের বাইরে উন্নত আর্থিক বাজারে বিনিয়োগ করে। তহবিল থেকে ব্যয় বাজেট নিয়ম (হ্যান্ডলিংসরেগলেন) দ্বারা সীমাবদ্ধ, যা তহবিলের মোট মূল্যের বাস্তব মূল্য ফলনের বেশি ব্যয় করতে দেয় না।[৬১]
১৯৬৬ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে, নরওয়ের কোম্পানিগুলো ৫,০৮৫টি তেল কূপ খনন করেছে, যার বেশিরভাগইউত্তর সাগরে অবস্থিত।[৬২] যে তেল ক্ষেত্রগুলো এখনো উৎপাদন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মধ্য উইস্টিং[৬৩] এবং কাস্টবর্গ তৈলক্ষেত্র।[৬৪] উভয় তৈল ক্ষেত্রইবারেন্টস সাগরে অবস্থিত।
নরওয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাছ রপ্তানিকারক।[৬৫][৬৬] মাছের খামার ও ধরা মাছ থেকে প্রাপ্ত মাছ মূল্যের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম (তেল/প্রাকৃতিক গ্যাসের পরে) রপ্তানি পণ্য গঠন করে।[৬৭][৬৮] নরওয়ে বিশ্বের বৃহত্তম স্যামন উৎপাদক।[৬৯]
জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নরওয়ের বৈদ্যুতিক শক্তির প্রায় ৯৮-৯৯% উৎপন্ন করে, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।[৭০]
নরওয়েতে উল্লেখযোগ্য খনিজ সম্পদ রয়েছে, এবং ২০১৩ সালে, এর খনিজ উৎপাদনের মূল্য ছিল ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সবচেয়ে মূল্যবান খনিজ হলোক্যালসিয়াম কার্বনেট (চুনাপাথর), নেফেলিন সায়েনাইট, ওলিভিন, লোহা,টাইটানিয়াম, এবংনিকেল।[৭১]
২০১৭ সালে, গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড নিয়ন্ত্রিত সম্পদের মূল্য ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রতি জনপ্রতি ১৯০,০০০ মার্কিন ডলারের সমান) অতিক্রম করে,[৭২] যা নরওয়ের ২০১৭ সালের জিডিপির প্রায় ২৫০%।[৭৩] এটি বিশ্বের বৃহত্তম সার্বভৌম সম্পদ তহবিল।[৭৪]
প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অন্যান্য দেশ, যেমন রাশিয়া, নরওয়ে থেকে শিখতে চেষ্টা করছে একই ধরনের তহবিল প্রতিষ্ঠা করে। নরওয়ের তহবিলের বিনিয়োগ নৈতিক নির্দেশিকা দ্বারা পরিচালিত হয়; উদাহরণস্বরূপ, তহবিলটি এমন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে পারে না যারা পারমাণবিক অস্ত্রাংশ উৎপাদন করে। নরওয়ের অত্যন্ত স্বচ্ছ বিনিয়োগ পরিকল্পনা[৭৫] আন্তর্জাতিক ভাবে প্রশংসিত।[৭৬]
নরওয়ের কম জনঘনত্ব, সংকীর্ণ আকৃতি এবং দীর্ঘ উপকূলরেখার কারণে গণপরিবহন ব্যবস্থা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় অনুন্নত। সাম্প্রতিক কালে নরওয়েজীয় পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় রেল, সড়ক এবং বিমান পরিবহনের উন্নয়নের জন্য অসংখ্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের অবকাঠামো উন্নত করছে।[৭৭] দেশের বৃহত্তম শহরগুলির মধ্যে একটি নতুন উচ্চ-গতির রেল ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা চলছে।[৭৮][৭৯]
নরওয়ের প্রধান রেল নেটওয়ার্কে ৪,১১৪ কিলোমিটার স্ট্যান্ডার্ড গেজ লাইন রয়েছে, যার মধ্যে ২৪২ কিলোমিটার ডাবল ট্র্যাক এবং ৬৪কিলোমিটারউচ্চ-গতির রেল (২১০ কিমি/ঘণ্টা) এবং ৬২% বিদ্যুতায়িত রয়েছেটেমপ্লেট:১৫ কেভি এসি।[৮০] সমগ্র নেটওয়ার্কটির মালিকানা Bane NOR-এর।[৮১] যাত্রীবাহী ট্রেন ভিওয়াই, এসজে, গোঅ্যাহেড ইত্যাদি কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত হয়। মালগাড়ি কার্গোরেল এবং অনরেল দ্বারা পরিচালিত হয়।[৮২]
নতুন অবকাঠামো এবং রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ রাষ্ট্রীয় বাজেটের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়,[৮৩] এবং যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য ভর্তুকি প্রদান করা হয়।[৮৪] NSB দীর্ঘ-দূরত্বের ট্রেন পরিচালনা করে, যার মধ্যে রয়েছে নৈশকালীন ট্রেন, আঞ্চলিক পরিষেবা এবং চারটিকমিউটার ট্রেন ব্যবস্থা।[৮৫]
অসলো বিমানবন্দর
নরওয়ের সড়ক নেটওয়ার্কে প্রায় ৯৫,১২০ কিলোমিটার মাইল রয়েছে, যার মধ্যে ৭২,০৩৩ কিলোমিটার পাকা এবং ৬৬৪কিলোমিটার মোটরওয়ে।[৮৬] সড়ক রুটের চারটি স্তর হলো জাতীয়, কাউন্টি, পৌর এবং ব্যক্তিগত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় রুটগুলি ইউরোপীয় রুট স্কিমের অংশ। জাতীয় এবং কাউন্টি রাস্তাগুলি নরওয়েজিয়ান পাবলিক রোডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দ্বারা পরিচালিত হয়।[৮৭]
নরওয়েতে বিশ্বের সর্বাধিক নিবন্ধিত মাথাপিছু ইলেকট্রিক যানবাহন প্রতি রয়েছে।[৮৮][৮৯][৯০] ২০১৪ সালের মার্চে, নরওয়ে প্রথম দেশ হয়ে ওঠে যেখানে প্রতি ১০০টি যাত্রীগাড়ির মধ্যে ১টিরও বেশি প্লাগ-ইন ইলেকট্রিক।[৯১] প্লাগ-ইন ইলেকট্রিক বিভাগের বাজার শেয়ার নতুন গাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে বিশ্বে সর্বোচ্চ।[৯২] নরওয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে গ্যাসোলিন এবং ডিজেল চালিত যানবাহনের বিক্রয় নিষিদ্ধ করতে চায়।[৯৩]
নরওয়েতে ১৪৬টি বিমানবন্দর রয়েছে,[৮৬][৯৪] যার মধ্যে ৪৩টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অ্যাভিনর দ্বারা পরিচালিত।[৯৫] বিমানবন্দর বছরে দশ লক্ষেরও বেশি যাত্রী পরিবহন করে।[৯৪] ২০০৭ সালে মোট ৪১,০৮৯,৬৭৫ যাত্রী নরওয়ের বিমানবন্দরগুলির মধ্য দিয়ে যাতায়াত করেছে, যার মধ্যে ১৩,৩৯৭,৪৫৮ জন আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিল।[৯৪]
নরওয়ের প্রধান বিমান প্রবেশদ্বার হলো অসলো বিমানবন্দর[৯৪] যা অসলো থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত[৯৬][৯৭]
২০১৯ সালে, নরওয়েবিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ভ্রমণ ও পর্যটন প্রতিযোগিতা রিপোর্টে ২০তম স্থানে ছিল।[৯৮] নরওয়েতে পর্যটন ২০১৬ সালে রিপোর্ট অনুযায়ী জিডিপির ৪.২%।[৯৯] দেশের প্রতি পনেরো জনের মধ্যে একজন পর্যটন শিল্পে কাজ করেন।[৯৯] পর্যটকদের অর্ধেকেরও বেশি মে থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে ভ্রমণ করেন।[৯৯]
↑The Spitsbergen Treaty (also known as the Svalbard Treaty) of 9 February 1920 recognises Norway's full and absolute sovereignty over the arctic archipelago of Spitsbergen (now calledSvalbard).[৬]
↑"The World Factbook"।Central Intelligence Agency Library। Central Intelligence Agency। ২৪ এপ্রিল ২০১৩ তারিখেমূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ মে ২০১৬।
12"Human development indices 2008"(পিডিএফ)।Human Development Report। hdr.undp.org। ১৮ ডিসেম্বর ২০০৮। ১৯ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখেমূল থেকে(পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১২ মে ২০০৯।
12"The Monarchy"। Norway.org। ২৪ জুন ২০১০। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখেমূল থেকে আর্কাইভকৃত।উদ্ধৃতি ত্রুটি:<ref> ট্যাগ বৈধ নয়; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "norway.org" নামটি একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে
↑Nordsieck, Wolfram (২০১১)।"Parties and Elections in Europe"। parties-and-elections.de। ৩ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখেমূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১১।Storting, 4-year term, 4% threshold (supplementary seats)
↑"২০২৪ থেকে কাউন্টি বিভাগ" (নরওয়েজিয়ান বোকমাল ভাষায়)। regjeringen.no। ৫ জুলাই ২০২২। ১৭ মার্চ ২০২৩ তারিখে মূল থেকেআর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ জানুয়ারি ২০২৪।
↑"স্থানীয় সরকার"। Norway.org। ১০ জুন ২০০৯। ১১ জুন ২০১০ তারিখেমূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৭ জানুয়ারি ২০১০।
↑Aslaug Moksnes.Likestilling eller særstilling? Norsk kvinnesaksforening 1884–1913 (p. 35), Gyldendal Norsk Forlag, 1984,আইএসবিএন৮২০৫১৫৩৫৬৬
↑Toivanen, Reetta; এবং অন্যান্য (২০০৩)। Götz, Norbert (সম্পাদক)।Civil Society in the Baltic Sea Region। Ashgate Publishing, Ltd.। পৃ.২০৫–২১৬।আইএসবিএন৯৭৮-০৭৫৪৬৩৩১৭৪।
↑"Secondary Industries"।This is Norway। Statistics Norway। ১৪ অক্টোবর ২০১৯। পৃ.৭৫। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে মূল থেকেআর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০২০।
↑"বিঞ্জ এবং পার্জ"।The Economist। ২২ জানুয়ারি ২০০৯। ৬ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে মূল থেকেআর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩০ জানুয়ারি ২০০৯।নরওয়ের বিদ্যুতের ৯৮-৯৯% জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আসে।
↑"তহবিল"।Norges Bank Investment Management (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ২১ নভেম্বর ২০১৮ তারিখেমূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৪ জুন ২০১৯।২০১৭ সালে তহবিলের মূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে
↑"জাতীয় হিসাব – SSB"।Statistics Norway (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ১১ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে মূল থেকেআর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০২০।Statistics Norway জাতীয় হিসাব
↑"স্বচ্ছতা"।www.nbim.no (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ২১ নভেম্বর ২০১৮ তারিখেমূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ নভেম্বর ২০১৮।
↑"বিনিয়োগ: নরওয়ের নীড়"।Financial Times (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ১৯ আগস্ট ২০১২। ১০ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে মূল থেকেআর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ নভেম্বর ২০১৮।
↑"এভাবে সংগঠিত হয়েছে নরওয়ের রেলপথ"।Regjeringen.no (নরওয়েজিয়ান বোকমাল ভাষায়)। নরওয়েজিয়ান সরকার। ৩ জুলাই ২০২৩। সংগ্রহের তারিখ ৯ আগস্ট ২০২৪।
↑নরওয়েজিয় জাতীয় রেল প্রশাসন।"সম্পর্কে"। ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭ তারিখেমূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুলাই ২০০৮।
↑নরওয়েজিয় পরিবহন মন্ত্রণালয় (১৬ জুন ২০০৬)।"জনসাধারণের পরিবহন" (নরওয়েজীয় ভাষায়)। ২০ জুন ২০০৮ তারিখে মূল থেকেআর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুলাই ২০০৮।
↑হান্নিসডাহল, ওলে হেনরিক (৯ জানুয়ারি ২০১২)।"২০১১ সালে অসাধারণ ইলেকট্রিক যানবাহন বিক্রি"[২০১১ সালে দুঃসাহসিক ইলেকট্রিক যানবাহন বিক্রি] (নরওয়েজীয় ভাষায়)। গ্রন বিল। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখেমূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০১২।